গল্পঃআলেয়া। 

0
259

গল্পঃআলেয়া।

Borhan uddin

ওস্তাদজী আছে কি? নুরুন্নাহারের ধবধবে অর্ধনগ্ন পিঠখানা নজরে আসতেই মাথা নিচু করে নেয় ওবায়েদ ।গোসল সেরে আসা নুরুন্নাহার ওবায়েদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে ভেজা শাড়িখানা পিঠের দিকে পেঁচিয়ে বলল,সে তো গুদারা ঘাটের দিকে গেল।কিছু কইতে হইব?

না,সুর বান্দনের লাইগ্যা আইছিলাম।কিছুতেই বানতে পারতাছিনা।আইচ্ছা আমি সন্ধ্যার দিকে আমুনে।এটুকু বলে পেছন ফিরে পা বাড়াচ্ছিল ওবায়েদ।নুরুন্নাহার গলা বাড়িয়ে বলল,ভর দুপুরে আইলা। চাইরড্যা ভাত মুখে দিয়া যাও।বারান্দায় পাটিডা বিছাইয়া বও, আমি কাপড়ডা ছাইড়া আইতাছি।

ওবায়েদ নানা ছুতোয় ওস্তাদ ছুরোত মিয়ার বাড়িতে হুটহাট চলে আসে। কখনো দুটো ভাতের আশায়,কখনো সুর বাঁধতে,কখনো দলের সাথে ওস্তাদের ডাকে।আর কখনোবা মনের মাঝে জমাট বাঁধা কিছু একটাকে প্রশ্রয় দিতে। ওবায়েদের বাড়ি থেকে ছুরোত মিয়ার বাড়ি বেশ দূরের পথ।মাঝে মরা গাঙ আর বিশাল বিল।কাদা পানি মাড়িয়ে এই দূরের পথ পাড়ি দিতে ওবায়েদের ক্লান্তি আসেনা,কোন এক অদ্ভুত শক্তি খুব করে টানে তাকে।

কাঁঠালের বিচি ভর্তা আর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত ধীরগতিতে মুখে তুলে নিচ্ছে ওবায়েদ।নুরুন্নাহার জানে ওবায়েদের বেশ খিদে পেয়েছে তাই সুর বাঁধার অজুহাতে মাঝ দুপুরে এসে হাজির সে।নুরুন্নাহার পানির জগটা এগিয়ে দিয়ে বলল,জানোই তো মেলা দিন হইল তোমার ওস্তাদ কোন বায়না পায়না। তাই খাওনদাওনের এই দশা।কাইল যে কি রান্ধুম আল্লাহ ই জানে।ওবায়েদ জগের মুখে মুখ লাগিয়ে ঢকঢক করে পানি খেয়ে বলল,ভর্তাডা মজা হইছে কিন্তু।নুরুন্নাহার কিছু একটা বলতে যাবার আগেই ছুরোত মিয়ার গলার আওয়াজ শোনা গেল।ছুরোত মিয়া কলার ছুটায় বিশাল সাইজের ইলিশ বেঁধে বাড়িতে ঢুকেই বলল,ও নুরু! নুরু! দেহো কত্ত বড় ইলিশ লইয়্যা আইছি।নুরুন্নাহার ছুরোতের হাত থেকে ইলিশটা নিয়ে বলল,বায়না পাইছেন? ছুরোত মিয়া নুরুন্নাহারের উত্তর না দিয়ে ওবায়েদের দিকে তাকিয়ে বলল,আরে ওবায়েদ মিয়া যে! আইলা কখন? ওবায়েদ আঙুল চাটতে চাটতে বলল,একটু আগেই আইছি।নুরুন্নাহার উত্তরের আশা না করে বঁটি নিয়ে ইলিশ কাটতে বসে গেছে।

হুনো মিয়া,আইজা সার রাইত থাকুন লাগব।কাইল দুপুরে রওনা দেওন লাগব উসমানচরের দিকে। তিন হাজার টেকা বায়না দিছে,গান শ্যাষ হইলে বাকি দুই হাজার দিব।দলের বাকি সবাই আইসা পড়ব, তুমি যাইয়োনা কইলাম। থালায় পানি ঢেলে নিয়ে চুমুক দিয়ে ওবায়েদ বলল, জ্বে আইচ্ছা।

পাটকাঠির বেড়া, ছনের চালার মাটির ঘরটা বড় ঘর থেকে বিশ কদম দূরে। সেখানেই সুর বাঁধা, বাঁশির সুর তোলা,আর সারা রাত ঢোলের ঢুমঢাম আওয়াজ চলে। মুজিব, হুসনায়ারা, পঙ্কজ, খলিল বিকেল নাগাদ চলে এসেছে।খেঁজুর পাতায় বোনা পাটিতে সবাই গোল হয়ে বসেছে।ওবায়েদ গলা ছেড়ে গাইছে,

আঁতুড়ঘরে দেখলি যারে, শুইষা নিলি বক্ষ যার

দিন ঘুরিতে কারই মায়ায় করলি তার ঘর ছাড়।।

যার পেটেতে লাথি দিলি অবুঝও কালে
বয়স বাড়ার বয়সেতে সেই পেটে আবার লাথি দিলি কারও মায়ার ছলে?

মায়া টেকে নারে দুইদিন বুঝলি নারে তুই
এই মায়া যে কাল হবে বুঝবি একদিন তুই

বোঝাবুঝির সেই ক্ষণেতে খুঁজবি যারে তুই
আঁতুড়ঘরের সেই মানুষটা রইবে গোরেতে শুই

আঁতুড়ঘরে দেখলি যারে, শুইষা নিলি বক্ষ যার

দিন ঘুরিতে কারই মায়ায় করলি তার ঘর ছাড়।।

পর্যায়ক্রমে ছুরোত মিয়া,হুসানায়া সুর বেঁধে চলেছে।এ যেন সুরের স্বর্গ। বড় ঘর থেকে নুরুন্নাহার মুগ্ধ হয়ে শুনছিল ওবায়েদের বাঁধা সুরগুলো।ওবায়েদের গান শুনে নুরুন্নাহারের তার মায়ের কথা মনে পরে গেছে।চোখ থেকে টুপটাপ পানি ঝরে চলেছে।নুরুন্নাহের মনে পরে,এইতো সেদিনও তার মা জুমুতি বানু তার মাথায় বিলি কাটতে কাটতে ঘুম পাড়িয়ে দিত।ডিম বেচা টাকাটা আঁচলে বেঁধে রাখত হাটের দিনে মালাই কিনে দেবার জন্য।মা টা তার আশ্বিনের মাঝ রাত্তিরে দাপাদাপি করে মরে গেল।

কে?
-আমি,ওবায়েদ।

বাইরে খাড়াইয়া আছো কেন? ঘরে আও।
আচঁল টেনে এনে দ্রুত চোখ মুছে নেয় নুরুন্নাহার।

কানতাছিলা কেন! কি হইছে তোমার? মনে দুঃখ পাইছো কোন কারণে?

সদ্য মোছা চোখ থেলে টপটপ করে আরো কয়েক ফোঁটা পানি নুরুন্নাহারের চিবুক চুঁইয়ে গড়িয়ে পরে।নুরুন্নাহার এবার আর চোখ মোছেনা। ধরা গলায় বলে,মায়ের জন্য মনডা কানতাছে। আর দুঃখর কথা কইলা! সে তো আছেই।ছুরোত মিয়া গানের কথায় বেবাক মাইনষের মনের দুঃখর গান গায়।মজার কথা কি জানো,চোখ মোছার পরও তুমি টের পাইছো আমি কানতাছিলাম অথচ সারা রাইত ছুরোত মিয়ার লগে শুইয়া কাইন্দা বালিশ ভিজাইয়া ফেলি তবুও সে টের পায়না।সংসারে এর চেয়ে বড় দুঃখ কি আছে আর?

চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসা নুরুন্নাহারের চোখের পানি নিভৃতে মেঝের মাটিতে পড়া মাত্রই ক্ষুধার্ত মাটি তা শুষে নিচ্ছে।পিটপিট করে জ্বলতে থাকা কুপির আলোয় সে পানি ওবায়েদের চোখ এড়ায় না।ওবায়েদ কুঁজো হয়ে দু হাত দিয়ে নুরুন্নাহারের চোখের পানি মুছে দেয়,নুরুন্নাহার ওবায়েদের হাত দুটো মুখের সাথে খানিক্ষণ ধরে রাখে।ওবায়েদ হাটু গেড়ে নুরুন্নাহারের পায়ের কাছে বসে পড়েছে,নুরুন্নাহারের খানিকটা ঝুঁকে এসেছে।দুটো অতৃপ্ত আত্না একে অপরের ভেতরটা ছুঁয়ে দিচ্ছে তৃপ্ত এক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।

কয়দিন থাকবেন উসমানচরে?

-সপ্তাহখানেক তো থাকুন লাগে।

এত্তদিন কেন! আর আমি এই একলা বাড়িতে এতদিন কেমনে থাকমু?

-ছুরোত মিয়া বরাবরের মত ঠান্ডা গলায় বলল,আগেও থাকছো অনেকবার।আর হাসনার মায়েরে তো ডাক দিলে পাইবাই।

হ,আগে থাকছি।আগে মাসও থাকতে পারছি। অপেক্ষা করতে পারছি কারো জন্য,কেউ আইবো।আইয়া আমার হাতখানা ধইরা কাছে নিয়া জিগাইতো গতর হাত কেমন।মুখ কালা থাকলে সে আমার গোপন ব্যথায় হাত বুলাইতো।হেই অপেক্ষা আছিল কাছে পাওনের অপেক্ষা,এক মধুর অপেক্ষা।অহন তো অপেক্ষা করি কোন একটা মানুষের লাইগা যে আইলে একলা বাড়িতে থাকোনের ভয় থাহেনা।অহন অপেক্ষা করি ভয় কাটানোর অপেক্ষা, এই অপেক্ষায় পঁচা ঘায়ের মত। সারা গতরে পঁচন ধইরা মরনের অপেক্ষা।

-ছুরোত হুঁকোখানা চটের ব্যাগে পুরে যন্ত্রের গলায় বলল, বয়স তো কম হইল না।অহনো কুয়ারা করার বয়স আছে? আমি গেলাম,টেয়া পয়সা আছে নি?

হ আমার বয়স হইছে।বত্রিশ বছর মেলা বয়স।তয় মজার কথা হইল,হুসনায়ারার বয়স পঁয়ত্রিশ পার হইলেও সে আপনের কাছে ষোল বছরের যুবতী।হেই লাইগ্যাই ভাতুড়িয়ার মেম্বারের বাড়ির ছোট কামরার ভেতর তার লগে মাখামাখি কইরা শুইয়া ভোর করতে পারেন।

-ছুরোতের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরে।দাঁতে দাঁত কটমট করে অগ্নি চক্ষুতে বলল,কোন বান্দির পুতে তোরে এই কথা কইছে? পঙ্কজ কুত্তার বাচ্চাডা কইছে, না?

নুরুন্নাহার চোখ মুছে বলল,না সে আমারে কয় নাই।তোমার দলের কারো লগেই এইসব আলাপ সালাপ করিনাই কোনদিন।তুমি হয়তো জানোনা মেম্বারের দুই নম্বর বউ আমার মামাতো বইন।

-ছুরোত কথা খুঁজে পায়না।রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে গুদারা ঘাটের দিকে পা বাড়ায়।

ট্রলার ঘোড়াকান্দি ছেড়ে এসেছে ঘন্টাখানেক হলো।টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে।ছুরোত মিয়া তার দলবল নিয়ে গোল হয়ে বসেছে।পঙ্কজ বাঁশিতে করুণ সুর তুলেছে।ওবায়েদের কাছে মাথার ওপর থাকা মস্ত আসমানকে নুরুন্নাহারের ক্রন্দনরত চোখ মনে হচ্ছে। আসমানের সাদা মেঘের মাঝে ছুটতে থাকা কালো মেঘগুলো যেন নুরুন্নাহারের চোখের মণি আর টিপটিপ করে ঝরতে থাকা বৃষ্টি যেন গতরাতের ঝরে যাওয়া নুরুন্নাহারের চোখের পানি।ওবায়েদ হাত বাড়িয়ে দু ফোঁটা পানি নিয়ে নিজ চোখ ছুঁইয়ে দেয়।

বাঁশির সুর,দোতারার টুংটাং, ঢোলের ঢুমঢাম আওয়াজ থামিয়ে ওবায়েদ গলা ছেড়ে ধরেছে,

“কানাদাইলি তুই এই আষাঢ়ে, কানবি রে তুই ঐ আষাঢ়ে
মন থুইয়া শরীল লইয়া মাতলি তুই কোন ভুলেতে

ভব মাঝে শরীলরে তোর গিলে খাবে মাটিতে
মনের দাম বুঝলিনারে ওরে বোকা পাপীরে

ধ্যানে জ্ঞানে সুবোধ রে তুই
সংসার মাঝে সাধক রে তুই

কোন পাপেতে কেন রে আজ দিলি তারে ফাঁকি ;
পাপের হাটে হাঁটবিরে তুই হারায় মনো পাখি

কানাদাইলি তুই এই আষাঢ়ে, কানবি রে তুই ঐ আষাঢ়ে
মন থুইয়া শরীল লইয়া মাতলি তুই কোন ভুলেতে ”

হুসনায়ারা ক্লান্ত চোখে পঙ্কজকে দেখে নেয়।পঙ্কজ হুসনায়ারার চোখে চোখ পড়তেই চোখ ফিরিয়ে নেয়।

বৃষ্টিতে মাটির রাস্তা বেশ পিছলে হয়ে আছে।ছুরোত মিয়া আর উসমানচরের ইউনিয়ন মেম্বারের চামচা গফফার হ্যাজাকের আলোয় আগে আগে হেটে চলেছে।মাঝে মুজিব, খলিল আর ওবায়েদ পা টিপেটিপে হেঁটে চলেছে।সবার শেষে হুসনায়ারা আর পঙ্কজ।

আমার উপর গোসসা করছো?

– পঙ্কজ অভিমানী গলায় বলল,আমার গোসসায় কার কি আহে যায়?

আহে,আমার আহে।

-বেশ্যা গো মত কথা কবিনা।বেশ্যারা যার লগে শোয় তারেই জামাই কয়।আমার লাইগা তোর কি আহে আর কি যায় হেইডা আমি ভালা কইরাই জানি।

হুসনায়ারার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে নরম মাটি পিষে ফেলে। খানিক্ষণ পর শান্ত গলায় বলল, ছুরোত দলে না নিলে তুমি আমি না খাইয়া মরমু।ছুরোত কাছে ডাকলে পেটের দায়ে না যাইয়া উপায় নাই।বেশ্যা কইতেই পারো,নিজের পেট বাঁচাইতে তোমার পেট বাঁচাইতে মাঝেমধ্যে বেশ্যা পনা করি।তোমার প্রতি আমার টান কতখানি হেইডা তো জানোই।কই একদিনও তো হাত ধইরা কইলানা, চল হুসনা বিয়া করি।চল হুসনা,করমুনা এই গানের দল।উলটা তো ছুরোতের পায়ে ধরো কয়দিন পর পর যাতে দল থেইকা বাদ না দেয়। পারলে একদিন বেডা মাইনষের মত হাত ধইরা তোমার ঘরে যাইতে কইয়ো, এই হুসনা তোমার বান্দি হইয়া তোমার পায়ে পইরা থাকব।

পঙ্কজ ঈষৎ অন্ধকারেও যেন হাত বাড়িয়ে রাখা হুসনায়ারার মুখখানা দেখতে পায়।হুসনায়ারার কথার ঘোরের বাঁশঝাড়ের কঞ্চির গুঁতোও যেন টের পায়না সে।

গত চারদিন ধরে ক্রমাগত বৃষ্টি হচ্ছে।মাঠঘাটে হাঁটু পানি উঠেছে। এই বৃষ্টির ভেতরও মেম্বারের বাড়িতে রাতে নিয়ম করে গান গেয়ে চলেছে ছুরোত মিয়ার দল।রোজ শ খানেক মানুষ কচু পাতা, কলা পাতা কেউ গামছা মুড়ি দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে গান শুনতে আসে।

মেম্বারের বড়ঘরের টিনের চালে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির পানি আছড়ে পড়ছে।আস্ত খাসি জবাই হয়েছে।বিশাল বিশাল চারখানা কলাপাতায় গরম গরম খাসির গোস্ত ঢেলে দেয়া হয়েছে,আর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত।ছুরোত মিয়ার গানের দল গোল হয়ে একসঙ্গে খেতে বসেছে এমন সময় গোবিন্দগঞ্জের ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের লোক এসেছে পাঁচ হাজার টাকা বায়না করে গেছে ছুরোত মিয়ার সাথে।এখানে গান শেষ হবার পরদিনই গোবিন্দগঞ্জ যেতে হনে,চেয়ারম্যান ট্রলার পাঠিয়ে দেবে সময়মতো।খুশির সাথেই পেটভরে সবাই খেয়ে নিল।

ছুরোত মিয়ারা যেদিন গোবিন্দগঞ্জ যাবে সেদিন খবর এলো ছুরোত মিয়াদের হাসেমপুরে বন্যা এসেছে। কোনরকম খেয়েদেয়ে বন্যার পানি কমে আসার আশায় দিন গুনছে সবাই।ছুরোত মিয়া খানিক্ষণ চুপ থেকে বলল,ওবায়েদ মিয়া তুমি বাড়িত যাও।আমাগো বাড়িত গিয়া উঁচা একখান মাচা বানাইয়া দিবা।এই লও একহাজার টেয়া।ছুরোত মিয়া পঙ্কজের দিক তাকিয়ে বলল,তুমিও যাও মিয়া।খলিল,মুজিবগো বাড়িতে যাইয়া মাচা বানাইয়া দেওগা।কিছু খাওনও দিও।পঙ্কজ নিরীহ চোখে হুসনায়ারার দিকে তাকায়।হুসানা অসহায়ের মত মাটির দিকে চোখ নামিয়ে নেয়।দুটো মানুষ নিরবে মনের ভেতর কাঁদছে,কান্নার জলে মনের ভেতর বন্যা বইছে। সে বন্যা দেখবার কেউ নেই।অথচ বাইরের বন্যার জন্য কত আয়োজন!

অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাসেমপুরের দিকে আসতে হয়েছে পঙ্কজের।ওবায়েদ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল হাসেমপুরের দিক আসতে পেরে।ছোট্ট নৌকা করে আধ-মণ চাল, ডাল,তেল, আলু নিয়ে সোজা ছুরোত মিয়ার বাড়িতে এসেছে দুজন।চারদিকে শুধু পানি আর পানি।ছুরোত মিয়ার বাড়ির কাছে আসতেই ওবায়েদ গলা ছেড়ে ডাকল,নুরু! ও নুরু! কই গেলা?। ঘরের ভেতর দুটো চৌকির ওপরে বসে ছিল নুরুন্নাহার। খেয়ে না খেয়ে একা একা এই বন্যার ভেতর আটকা পড়া নুরুন্নাহার ওবায়েদের গলা শুনে পাগলের মত বলে উঠল,ওবায়েদ! তুমি আইছো! ওবায়েদ নৌকা নিয়ে ঘরের দরজার সামনে এসে দেখল নুরুন্নাহার চৌকির ওপর বসে আছে,চোখে পানি ছলছল করছে।ওবায়েদ লাফিয়ে পড়ে বুক সমান পানি ডিঙিয়ে কোনরকম চৌকির ওপরে উঠে এলো।নুরুন্নাহারের চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। এ পানি বলে দিচ্ছে,জনমানবহীন এই বাড়িতে সে কতটা অসহায় ছিল,বন্যার এ পানিতে তার চোখের পানিরও ভাগ রয়েছে,একলা নারীর জন্য কতটা পরীক্ষা নিয়েছে এ কদিনের বন্যা।ওবায়েদ নুরুন্নাহারের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,আমি আইছি গো নুরু! আমি আইছি।

ভারী বৃষ্টিতে বন্যার পানি ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।ঘরের চালা উঠিয়ে ফেলানো হয়েছে।চৌকির উপর বিশাল বড় বাঁশের মাচা করা হয়েছে।পলিথিন দিয়ে মাথাত ওপত মাচার চালা করা হয়েছে।

মাঝ রাত।টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে।স্টোভে ভাত আর আলু চড়িয়েছে নুরুন্নাহার। পাশে বসেই পেঁয়াজ কাটছে ওবায়েদ। নিচ থেকে বড় মাছের পানিতে পাক দেয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

হুসনারে লইয়া গোবিন্দগঞ্জ গেছে সে,তাইনা?

-পঙ্কজে কইছে, না?

হু।পঙ্কজেই কইলো।তার লাইগা এক চিমটি মায়া কাজ করেনা এহন।আগে করত।সে হুসনারে লইয়া থাহুক।আইচ্ছা ওবায়েদ,তুমি নিজের বাড়িত না গিয়া এইহানে আইলা কেন?

-ভাতে বলক উঠছে।সরাডা নামাও।

নুরুন্নাহার হাড়ি থেকে সরাতে নামানোর সময় বুক থেকে কাপড় সরে আসে।চুলার আঁচে ঘেমে আসা বুকে ওবায়েদের চোখ আটকে যায়।খেয়াল হতেই দ্রুত হাতে বুকে কাপড় টেনে নুরুন্নাহার শান্ত গলায় বলল,কইলানা যে কেন তুমি বাড়িত না গিয়া এইহানে আইলা।

– ঠিক যে কারণে আমার লগে থাকতে তোমার ডর করেনা,ঠিক যেই কারণে তোমার চোক্ষের পানি আমার সহ্য হয়না,ঠিক যেই কারণে তোমার চোক্ষের পানি মুছতে গেলে তুমি আমার হাত দুইডা ছাড়তে দেওনা ঠিক সেই কারণে আমি দুনিয়া ভুইলা তোমার ধারে আইছি।

নুরুন্নাহার ভাতের মাড় গলাতে গলাতে বলল,মাইয়্যা মাইনষের ষোলই পা দেওয়া বয়স আর ত্রিশে পা দেওনের বয়স বড় খারাপ জিনিস।ষোলতে প্রথম যৌবন আহে আর ত্রিশে সেই যৌবনে রঙ ধইরা চল্লিশে রঙ চইটা যায়।রঙ চটা যৌবনে পুরুষের রুচি নাই,তোমার রুচিও থাকবোনা ওবায়েদ।

ওবায়েদ উত্তর না দিয়ে কথা ঘুরিয়ে বলল,আইচ্ছা আলুডা মাখায় আমি। তুমি ভাত বাড়ো।নুরুন্নাহার একটা উত্তর খুঁজছিল আর এক চিমটি সাহস।দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নুরুন্নাহার ভাত বেড়ে নিলো।

ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার।দমকা বাতাস বইছে।বিশাল উঁচু মাচার উপর পাশাপাশি শুয়ে আছে দুজন।এই মুহূর্তে কাউকে দেখতে পারছেনা অথচ দুজন দুজনের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে।ওবায়েদের নিশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে।বাঁ হাতখানা নুরুন্নাহারের মাথায় রাখতেই নুরুন্নাহারের মুখে লাল আভা দেয়।

ওবায়েদ নুরুন্নাহারের দিকে এগিয়ে এসে মাথায় বিলি কাটতে কাটতে বলল,কবিরাজ কইছিল ছুরোত মিয়া নিজ দোষে বাপ হইতে পারবোনা।তয় আমি তো পারুম,অনেক দূরে যাইবা আমার লগে? একটা চান্দের মত মাইয়্যা দিবা আমারে?

নুরুন্নাহার খানিকিটা দূরে সরে আসে। ওবায়েদের যেন পা থেকে মাটি সরে যায়।কান দিয়ে ধোঁয়া ওড়ে যেন।

নুরুন্নাহার খানিক্ষণ চুপ থেকে বলল, তোমরা অন্য জগতের মানুষ। গান ই তোমাগো সব।গানে গানে অন্য মাইনষের দুঃখ কও,সুখের কথা কও, কৃষ্ণকলিরে ভালোবাসো। দিন ঘুরতেই কৃষ্ণকলির কান্দন,ব্যথা,অভিমানের মুখে লাথি মাইরা তোমরা গানের জগৎরে ভালোবাসো অথচ কৃষ্ণকলি একফোঁটা ভালোবাসার জন্য কি ছটফট টাই না করে! গানরে তোমরা ষোল বছরের যুবতী ভাইবা আদর কর,তার গোসসা ভাঙ্গাও,তার চোক্ষের পানি মোছ আর ঐদিকে কৃষ্ণকলি তোমার পাশে শুইয়া রাতভর কান্দে সে আওয়াজ তোমরা টের পাওনা।তোমাগো ভালোবাসা সবার লাইগা,কহনো হুসনায়ারা লাইগা কহনো নুরুর লাইগা আবার কহনো অন্য কারোর লাইগা।এমন উদার ভালোবাসা আমার লাগবোনা।

ওবায়েদ নুরুন্নাহারের খুব কাছে চলে আসে।নুরুন্নাহারের মাথায় হাত রেখে বলল, আমার কৃষ্ণকলি,শ্যামাবতী সব তুমি।আমার গান আর কেউ হুনবোনা,হুনামুনা।তোমারে হুনামু,গান ছাইড়া দিমু।এইহানে বরকত নাই,খালি পাপ আর পাপ।দলের মাইয়াগুলো এক একটা নাগিনী। আমি দল করমুনা,ভাটায় কাম করমু।যাইবা আমার লগে?

নুরুন্নাহার ওবায়েদের দিকে ঘেঁষে আসে।নুরুন্নাহারের মাথাটা ঠিক ওবায়েদের বুকের মাঝখানটায় ঠেকেছে।

সপ্তাহ দুয়েক পর আজ রোদ উঠেছে।পানি কমতে শুরু করেছে।চারটে বড় কলা গাছ কেটে ভেলা বানিয়ে তাতে ভেসে চলেছে ওরা দুজন।ভেলার ওপর ছোট্ট একটা হাড়ি,তাতে মুঠো তিনেক চাল আর চারটে আলু।এই হাঁড়ি নতুন কিছুর সাক্ষী হতে চলেছে।ভেলা স্রোতের টানে হামিদপুরের দিকে ভেসে চলেছে।

বছর সাতেক পেরিয়ে গেছে।গানের দলও এখন নেই। ছুরোতের চামড়ার ভাঁজগুলো আরো ঢিলে হয়েছে। পুরো বাড়িতে একলা মানুষের বাস।হুসনায়ারা আর পঙ্কজ সংসার পেতেছে বছর পাঁচেক আগেই।ওরা নতুন গানের দল করেছে,বয়স বাড়ায় কেউ ছুরোত মিয়াকে দলে ডাকেনা।পঙ্কজদের গানের দল এখন বেশ নাম কুড়িয়েছে।

আষাঢ় মাসের তৃতীয় শনিবার।ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির পানি টিনের চালে আছড়ে পড়ছে।ছুরোত মিয়া নুরুন্নাহারের ফেলে যাওয়া টিয়ে রঙা বালিশের কভার ভিজিয়ে কেঁদে চলেছে আসমানের সাথে পাল্লা দিয়ে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here