মা

0
211

মা

রিসার্চ এর জন্য ডাটা কালেক্ট করতে যেয়ে দেখতে পাচ্ছি, কোন উচ্চ শিক্ষিত মহিলা কে যখন জিজ্ঞেস করা হচ্ছে তার পেশা কী? তখন তিনি খুব লজ্জিত গলায় বলছেন– “আমি কিছু করি না,আসলে বাচ্চা অনেক ছোট তো।”,,,,

একজন কর্মজীবী নারীর সন্তান হিসেবে জানি, বাচ্চা পালনে তাকে কতটা কষ্ট করতে হয়,কত কিছু সহ্য করে অফিস-বাসা দুটোই সামলাতে হয়। আমার মা ভোর পাঁচটায় উঠে আমার বোনকে পড়তে বসাতেন, ভিকারুননিসায় মেয়েকে ভর্তি করাতে হবে তাই। রোজ সকালে আমার ঘুম ভাংতো বোনের কান্না শুনে, পড়া পারেনি তাই খেয়েছে মার,,,,সারাদিনের রান্না-বান্না,ঘর গুছানো শেষ করে,নিজে গোসল করে রেডি হয়ে আমার ৭ মাস বয়সী ভাইকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে নয়টা বাজতেই বোনকে কোচিং এ দিয়ে আম্মু অফিস যেত, আমি একা একা রেডি হয়ে বারটায় স্কুল বাসে উঠতাম। আম্মু আবার দুপুরে ৪০ মিনিটের জন্য এসে ভাই আর বোনকে নিজ হাতে খাইয়ে যেত।,,,,বাসের মেয়েরা খুব হাসাহাসি করত আমাকে নিয়ে—- সিঁথিটা মাঝখানে হয়নি, ঝুটি গুলো সমান হয় নি, জুতার ফিতায় ফুল তুলতে পারি নি,,,, ক্লাস ওয়ান এ পড়া আমি অসহায় চোখে ওদের হাসি দেখতাম।

স্কুলে আমার ছুটি হত ৪ টায়, বাস ছাড়বে ৬ টায়,,,, দুই ঘন্টা শেড এ বসে এর আম্মু,তার আম্মুর গল্প শুনতাম৷ তারা গল্প করতে করতে মেয়েদের অর্ধ তোলা লেকচার লিখে দিতেন এর তার খাতা থেকে,,, মেয়ে টিফিন অর্ধেক খেয়েছে,তাই বাকিটা তখনই বসিয়ে খাইয়ে দিতেন,,, কেউ আবার মেয়েকে কিছুক্ষণ পর শিশু একাডেমি তে নিয়ে যাবেন,তাই শেডে বসিয়ে বসিয়েই মেয়ে কে গান,আবৃত্তি practice করাতেন। অথচ সেই ক্লাস ওয়ান থেকে আমার সব লেকচার আমিই তুলতাম, নিজের টিফিন নিজেই খেতাম, শনিবার দুপুরে ভাত খেয়ে শিশু একাডেমি তে যাওয়ার জন্য লাল-সবুজ ড্রেস পরে নিজেই রেডি হতাম।,,,, তখন সেসব আন্টিদের আমি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতাম আর ভাবতাম আন্টিদের চিন্তাভাবনা জুড়ে খালি তাদের মেয়ে,,, আর কোন চিন্তা নাই,,,আমার মা র মত অফিসের চিন্তা নাই,,, 

আমি হন্য হয়ে ভিকারুননিসার বড় বড় সবুজ মাঠগুলায় দৌড়াতাম আর ভাবতাম,ছুটি হলে সবার মা ওদের নিতে আসে,আমার মা কেন আসে না??,,, মাঠের এক কোণায় যেয়ে আম গাছ তলাটার আড়ালে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতাম, নিজেই নিজের আম্মু সাজতাম আর গাছটাকে বানাতাম অন্য কারো আম্মু,,,,তারপর বলতাম,” জানেন ভাবী, মেয়েটা না কিচ্ছু খেতে চায় না। গাজরের হালুয়া করে দিলাম টিফিনে,তাও খেল না।” তারপর নিজের হাতকে আম্মুর হাত বানিয়ে কাল্পনিক গাজরের হালুয়া নিজেকেই খাইয়ে দিতাম,যেন জোর করে আম্মু আমাকে টিফিন খাওয়াচ্ছে বান্ধবীদের মা এর মত করে!!,,,,,, 

আব্বু যখন বলত,”তোমাকে কিন্তু বড় হয়ে ডাক্তার হতে হবে”,,,,তখন আমি বলতাম,ডাক্তার হলে কী চাকরী করা লাগবে না আব্বু??? ঠিক আছে,তাহলে ডাক্তারই হব!! সেই ছোট্ট আমি সে সময়েই কত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম,আমি কখনো চাকরি করব না— কিন্তু এখন ভাবি এই কথা কী আদৌ রাখতে পারব??? আমি জানিনা, কাজের লোক কিংবা কোন আত্মীয়ের বিন্দুমাত্র সহযোগিতা ছাড়া কীভাবে আমার কর্মজীবী মা তার তিনটা সন্তানকে বড় করেছে,,,,,কতটা ত্যাগ আছে, কতটা অসহায়ত্ব মিশে আছে তার জীবনে,,,,,আমি তো এভাবে পারব না! 

আমার আম্মু কখনো স্কুলে যায় নাই আমাকে আনতে,এমনকি ভিকারুননিসা র ডে শিফটে প্রথম ক্লাসের দিন ও না, শুধু আব্বু গেসিল। স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার দিনগুলাতে অবশ্য আম্মু-আব্বু দুইজনই গেসিল। মেট্রিক পরীক্ষার সময় প্রতিটা পরীক্ষাতেই আব্বু-আম্মু দুজনই আসত,এইচ এস সি তে শুধু গণিত পরীক্ষার দিন আম্মু গেল—- আম্মু পরীক্ষার সময় গেলে কেন যেন খুব ভরসা পেতাম। মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে দুই বেলা (সকালে আর রাতে) আর বাকি দুই ভাই-বোনকে তিন বেলাই আম্মু ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিয়েছে৷ ক্লাস টেনে উঠার পর আম্মুই খুজে খুজে স্যার দের বাসা আর কোচিং সেন্টার এ ভর্তি করে দিল। অফিসের ফাকে বের হয়ে বেইলি রোডে কোচিং এ নিয়ে যেত,,,, আমি বুঝতাম,বড় স্যারকে অনুনয় বিনয় করে কয়েক ঘন্টা আগে ছুটি নেয়ায় আমার মা র মুখে কিছুটা লজ্জা, কিছুটা আতংক— এই নিয়েও মেয়েকে পড়াতে নিয়ে যাচ্ছে সে। নিজেকে তখন খুব অপরাধী লাগত আমার। কলেজে উঠার পর তাই একা একা ই বাসে চলতে শিখলাম। একা একা ই কলেজ যেতাম বাসের দরজায় ঝুলে। আমরা তিন ভাই-বোন সাথে সায়েম কাকা,,,, বিকাল ৪টা থেকেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতাম বুভুক্ষের কাকের মত আর পথ চেয়ে ভাবতাম কখন আম্মু আসবে, সন্ধ্যার নাশতা বানাবে আর আমরা চা খেয়ে পড়তে বসব,,,,আম্মু রান্না ঘরে যাবে, টুং টাং শব্দ হবে—-একদম খালি প্রাণহীন বাসাটা প্রাণ ফিরে পাবে!!

আমার আম্মু চাকরি করে আমাদের বড় করেছেন, সেজন্য আমরা তিন ভাই-বোনই অসম্ভব গর্বিত।মা চাকরি করতেন বলেই আমরা আজ আর দশজনের চেয়ে স্বাবলম্বী হয়েছি, অস্বীকার করব না।চাকরীজীবি বলে আম্মুর রোজকার দায়িত্ব কিংবা আদর আহ্লাদের কোন হেলা ফেলা ছিল না, তবে এটাও ঠিক একজন গৃহিণী মা বাচ্চার জন্য যে এক্সট্রা কেয়ারটা নেন,সেটা কখনই একজন কর্মজীবী মা এর পক্ষে নেয়া সম্ভব হয় না। বর্তমানের অনেক কর্মজীবি মহিলা, যাদের মা গৃহিনী ছিলেন, এই স্ট্যাটাস টা পড়ে উপরের কথাটা মেনে নিতে চাইবেন না হয়তো,,, কিন্তু আমি জানি আমার ছোটবেলা কেমন গিয়েছে। আপনিও জানতেন যদি আপনার মা কর্মজীবী হতেন। স্কুলের শেডের প্রতিটা বিকেল আমার কতটা অসহায় লাগত সেই অনুভূতি এখনো আমার মনে জীবন্ত!

কর্মজীবী মা দের জন্য সারা জীবন এর শ্রদ্ধা, তবে,যারা বাচ্চার জন্য চাকরি করছেন না বলে লজ্জিত হচ্ছেন,মাথা নত করে ফেলছেন, তাদের বলব,একদমই লজ্জিত হবেন না,অবনত হবেন না।,,,, বরং গর্ব করুন, এই যুগেও সময়ের প্রয়োজনে চাকরি না করে নিজের পুরোটা সময় সন্তানকে দিয়ে দিচ্ছেন, এর চেয়ে বড় sacrifice আর কিছু হতে পারে না। সবাই যা পারছে না, আপনি তা পারছেন, , ,, এটা তো কম কিছু না,,,,, এটা আপনার লজ্জা না, এটা আপনার অহংকার!!  

#sushmita_zafar

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here