গল্প  আমাদের মা হতে নেই

0
2239

গল্প  আমাদের মা হতে নেই
*****************************

Dilu Dilara

১৯৯৫ সালের ৩১ শে অক্টোবর ভোরের দিকে আমার কেমন অস্বস্তি হতে লাগলো । পাশে নাক ডাকতে থাকা আমার স্বামী সাইদ কে কয়েক বার চিকন স্বরে ডেকে ধাক্কা দিতে দিতে বল্লাম , ”এই এই ওঠো আমার কেমন জানি লাগছে ” কিন্তু আমার স্বামী উ উ শব্দ করে পাশ ফিরে আবার শুয়ে পড়ল ।

আমি আস্তে আস্তে মেঝেতে পাতা বিছানা থেকে দেয়াল ধরে উঠে দাঁড়া্লাম। স্থানীয় ম্যাটারনিটির ডাক্তারের হিসাব অনুযায়ী এখনো ১৩ দিন বাকী আছে। নভেম্বরের ১৩ তারিখে ডেট দিয়েছেন ডাক্তার । আজ ৩১ অক্টোবর ।

মগবাজার মিরবাগের এই একতলা বাসাটায় ৬ মাস হল আমরা সাবলেট এসেছি । আগে ছিলাম এই গলির ই শেষ মাথায় ছয় তলা বাসাটায় কিন্তু এই অবস্থায় এত উঁচুতে ওঠা নামা অসম্ভব হয়ে পরেছিল তাই এই একতলা বাসাটায় উঠেছি ।

যার সাথে সাব লেট থাকি সেই ভদ্রলোকের মালিবাগ কাঁচা বাজারে মুদি দোকান আছে। যখন সাইদ বাসায় থাকেনা বৌটা মাঝে মাঝে আমার ঘরে এসে বসে । মাঝে মাঝে বাটিতে করে তরকারী এনে লাজুক হেসে বলে ” আপা খাইয়া দেখেন আমি ভাল রান্না করতে পারিনা ”।

ওর বর মানে মুদি দোকানদার টাকে দেখলে আমার কেমন যেন অস্বস্তি হতে থাকে।আমার এই অবস্থাতেও কেমন হা করে তাকিয়ে থাকে।আমি বেশ কয়েকবার সাইদ কে এই কথা বলেছি ।সাইদের কথা এটা নাকি আমার মনের ভুল। মালেক মানে এই দোকানদার নাকি অনেক ভাল মানুষ তা ছাড়া এই বাড়ি ছেড়ে দেওয়ারও কোন উপায় নেই এমন সস্তা বাসা এই মুহূর্তে কই পাবো! যেখানে সাইদের মাত্র কয়েকটা টিউশনির উপর সংসার চলছে । সামনে আরও খরচ বাড়ছে ।

সাইদ ছিল আমাদের পাশের বাড়ির ছেলে । সেও আমার মত মা বাবা হারা ।

বাবা হঠাৎ হার্ট এটাকে মারা গেল তখন আমার বয়স ১০ বছর । নানা মাকে নিয়ে অন্য জায়গায় বিয়ে দিলেন তারপর থেকে মায়ের সাথে আমার যোগাযোগ নেই । আমি চাচা চাচীর কাছে অনেকটা হেলাফেলায় বড় হয়েছি । কোন রকম প্রাইমারী পাশ করেছি ।

মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি সাইদ আর আমি , এমন বাবা মা হারা দুই জন মানুষ কে আল্লাহ কি ভাবে এক সাথে মিলিয়ে দিলেন !
আমরা ছিলাম এতিম হয়ত এই কারনেই নিজেদের মধ্যে একটা ভাল লাগা তৈরি হয়েছিল । সেখান থেকেই ভালবাসা আর একদিন লুকিয়ে সিনেমা দেখতে এসে দুই জনার কি যে হল সাথে সাথেই বিয়ের সিদ্ধান্ত । সাইদ তখন বিএ পাশ করে কাজের সন্ধানে ঢাকায় থাকা শুরু করেছে ।

নারায়ণগঞ্জের কাজী অফিসে বিয়ে করেই সাইদ আমাকে ওর মেসে এনে ঊঠালো ।

যেহেতু ছেলেদের মেস মহিলা থাকা নিষেধ তাই সাইদ বাড়ি ওয়ালাকে অনুরোধ করলো । ভাগ্যিস সেই সময় ওর রুমমেট বাড়ী চলে গিয়েছিল । তা নাহলে খুব বিপদ হত । আমরা সপ্তাহ খানেক এই বাসায় থেকে পরে বাড়ি ভাড়া করে অন্য বাসায় চলে গিয়েছিলাম।

আমি সাইদ কে জোরে ধাক্কিয়ে উঠালাম । ও তড়িঘড়ি করে পাশের রুমের মালেক ভাই আর ভাবিকে ডেকে তুলল । এত ভোরে মালেক ভাই নিজে খুজে দুইটা রিক্সা ডেকে আনলেন । আমাদের গন্তব্য ঢাকা মেডিকেল ।

যেদিন ঢাকা মেডিকেলে আমার মেয়েটা হল সেদিন থেকেই সাইদকে কোথাও খুজে পাওয়া গেল না । ঔষধ কেনার কথা বলে সেই যে সে চলে গেল আর ফিরে এলো না।

আমি মালেক ভাই আর তার স্ত্রীর সাথে হাসপাতাল থেকে ১ দিন পর মেয়ে কে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। ওনারা আমার জন্যে অনেক করলেন। এমন হয়ত কাছের মানুষ জন ও করে না।
বিভিন্না জায়গায় খোঁজ খবর করলেন ওর বাড়িতে খবর নিলেন কিন্তু সাইদ কে কোথাও খুজে পাওয়া গেল না ।

আমি উদ্ভ্রান্তের মত হয়ে গেলাম । মেয়ের দিকে ফিরেও তাকালাম না মালেক ভাই আর তার স্ত্রী রাত জেগে আমার মেয়ের দেখা শোনা করতে লাগলো যেন ওরাই ওর বাবা মা । সাইদ সত্যি ই বলেছিল মালেক ভাই অসামান্য একজন ভাল মানুষ

প্রায় এক সপ্তাহ পরের কথা

সেদিন ছিল শুক্রবার। মালেক ভাই জুম্মার নামাজ পড়ে এসে আমাকে বললেন ” বইন আপনারে আমার সাথে ঢাকা মেডিকেলে যাইতে হইব।ভাইয়ের খবর পাইছি ”।

আমাদের গলির ফ্রেণ্ডস লন্ড্রির একটা স্লিপ নাকি সাইদের পকেটে ছিল। সেই ঠিকানা ধরেই পাশের বেডের এক রোগীর আত্বিয় লন্ড্রি তে এসে খবর টা দিয়ে গেছে।

আমি মেয়েকে ওনার স্ত্রী র কাছে রেখে মালেক ভাইয়ের সাথে মেডিকেলে গিয়ে দেখি ততক্ষণে সব শেষ।

সেখানেই শুনলাম আমার জন্যে ঔষধ কিনতে যাওয়ার সময় এক্সিডেন্ট । ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস এক ই হাসপাতালে থেকেও আমরা জানতে পারিনি আমরা কত কাছাকাছি ছিলাম ।

এরপর যা করার মালেক ভাই ই করলেন। লোকজন দিয়ে আজিমপুরে সাইদের দাফনের ব্যাবস্থা করলেন

দিনে দিনে মেয়ে হয়ে গেল আমার কাছে দুই চোখের বিষ। শুধু মনে হতে লাগলো সাইদের মৃত্যুর জন্যে আমার মেয়েই দায়ী ।ওর জন্ম না হলে এমন হত না । আমি কেমন পাগল পাগল হয়ে গিয়েছিলাম ।

একদিন কাকা ডাকা ভোরে আমি আমার মেয়েকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে , গা ভর্তি জ্বর নিয়ে এই বাড়ি থেকে পালালাম। আমার এই সতের বছরের জীবনে একা এই মেয়ের ভার বহন করার ক্ষমতা আমার ছিল না। আমি জানি সবাই আমাকে প্রচন্ড ঘৃণা করবে। আর করাই স্বভাবিক।

আমি পালিয়ে একেবারে রেল স্টেশন। কোথায় যাব জানা নেই। সারাদিন রেলের যাওয়া আসা দেখলাম। মাঝে সাথে করে আনা পঞ্চাশ টাকা থেকে পাউরুটি কিনে খেলাম। একটা সময় মেয়ের জন্যে বুকের ভিতর খা খা করতে লাগলেও বুকে পাথর চাপা দিলাম

বিপত্তি বাধলো রাতের বেলা । স্টেশনের হাবিলদার লাঠির বারি দিয়ে স্টেশন থেকে বের করে দিল। আমি তবুও ওদের চোখ ফাঁকি দিয়ে একটা পরিত্যাক্ত বগীতে উঠে পরলাম । আমার এই ক্লান্ত জ্বরের শরীরে আর কিছু মনে নেই । পরের দিন ঘুম ভাঙতেই সামনে দেখলাম একজন কে । সেখানেই নার্গিসের দেখা পেলাম ।

আমার ঠাই হল কমলাপুর বস্তিতে । পেটের ক্ষুধার কাছে সব কিছু হার মেনে যায় । আমিও মানলাম। নার্গিস ই সেই পথ দেখালো। সেই পথ ধরে আমি এগুতে থাকলাম। দিনে পরে পরে ঘুমাই রাতে রঙ মেখে রাস্তায় দাড়াই। আমি আমার নিজের নাম ভুলে গিয়ে হয়ে গেলাম রেশমি ।

আমার মেয়েকে দেখার জন্যে মিরবাগের সেই বাড়ির সামনে কয়েকবার লুকিয়ে গিয়েছি। বারান্দায় মেলে দেওয়া ছোট ছোট কাঁথা কাপড় দেখে নিশ্চিত হয়েছি। কিন্তু আরেক দিন গিয়ে দেখি বারান্দায় মেলে দেওয়া বাচ্চাদের কাপড় নেই অন্য একজন মানুষ বারান্দায় বসে আছে। নিমিশেই বুকের ভিতর হাহাকার করে উঠল। আমি পাশের দোকানে জিজ্ঞাসা করে জানলাম। এক মাস আগে ওনারা এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন।

আজ প্রায় চৌদ্দ বছর হয়ে গেল। নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না। একবার ভাবি যা করেছি ঠিক ই করেছি। আমার এই অনিশ্চিত পঙ্কিল জীবনে ওকে না জড়িয়ে।

গলপ টা এখানেই শেষ হতে পারত কিন্তু হল না ।

একদিন রাতে মুখে রঙ মেখে স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি কাস্টমারের জন্যে । সেই সময় দেখলাম মালেক ভাই কে । সাথে স্ত্রী আর সাথে একটা ফ্রক পরা মেয়ে আর একটা ছেলে। আমি নিশ্চিত এ আর কেউ না আমার মেয়ে । সাথে লাগেজ। বুকের ভিতর ধক ধক করে উঠল ।

মেয়ে দেখতে একেবারে সাইদের মত হয়েছে। আমি পিলারের আড়ালে লুকিয়ে আমার মেয়েকে দেখি। আমার মেয়েকে খুব ছুঁতে ইচ্ছে করে । দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে।
বলতে ইচ্ছে করে মাগো দেখ আমি ই তোর মা ।

কিন্তু আজ আমারই দোষে , আমি এ সব কিছুই করতে পারিনা। আমার কিছুই বলা হয়ে ওঠেনা । আমার এই রঙ মাখা মুখটা নিয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারিনা কারন আমি তো একজন বেশ্যা !! আমাদের মা হতে নেই !!

আচ্ছা ওর নাম কি ? এমন সময় দেখলাম ট্রেন আসছে মালেক ভাই আমার মেয়েকে তাড়া দিচ্ছে ”এদিকে আয় খুশি ”

আমি ঠিক শুনলাম তো! এ যে আমারই নামে নাম রেখেছে!!

রচনাকাল
১০ ই জ্যৈষ্ঠ
১৪২৬ বঙ্গাব্দ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here