“আয়না”

0
256

“আয়না”

Ragib Hassan Antor

(১)
ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারটা চেঞ্জ করল নিতু।
ছবিতে বিষণ্ণ চোখে আমেরিকার নাইগ্রা জলপ্রপাতের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
আজ সকালে তাকে এই জলপ্রপাত দেখতে নিয়ে গেছিলেন সেলিমের বাবা-মা, মানে তার শ্বশুর-শাশুড়ি।
সেলিম তাদের সাথে যায় নি, সে আজকাল সব সময় ব্যস্ত থাকে!
সেলিমকে পর পর তিনবার কল দিয়েছে নিতু, প্রথমবার একটা মেয়ে স্প্যানিশ ভাষায় কি যেন বলে রেখে দিল, তারপর থেকে রিং হলেও কেউ ধরলো না।
এখন রাত ২টা বাজে, অন্য দিনগুলোতে সেলিম অন্তত এই সময়ের মধ্যে নেশায় বুত হয়ে হলেও বাড়ি ফিরত। গত দুই রাত ধরে তো বাড়িও ফিরছে না।
সেলিমের বাবা আমেরিকার একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যাবসায়ী। অর্থ-বিত্ত, আরাম-আয়েস কোন কিছুরই অভাব নেই তাদের।
দুই বছর আগে, দেশে ছুটি কাটাতে গিয়ে নিজের বখাটে ছেলের জন্য নিতুকে পছন্দ করেন তারা।
নিতুর বাবা-মা, অঢেল সম্পত্তি থাকা আমেরিকা প্রবাসী একটি সু পাত্রের! প্রস্তাব কি আর ফেলে দিতে পারেন, তাই ভার্সিটির প্রথম বর্ষেই পড়াশুনা ছেড়ে সেলিমের সাথে বিয়ে করে আমেরিকায় চলে আসতে হয় নিতুকে।
দেশে বাবা-মা কে সেলিমের কুকর্মের ব্যাপারে কিছু বললে, তারা শুধু কষ্ট করে মানিয়ে নেওয়ার কথা বলেন।
তাই এই সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ে নিঃসঙ্গ নিতুর এই বিষণ্ণতা তার সাথে ছায়ার মত লেগে আছে।
প্রকাণ্ড এক বাড়ীতে ফেসবুকিং করেই তার দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে।
এইত কিছুক্ষণ আগে, তার ভার্সিটির রুমমেট রানু, আজ জীবনে প্রথম বেতনের টাকায় বাবা-মার জন্য উপহার কিনেছে, রেস্টুরেন্টে কি কি খাবার খেয়েছে তার ছবি পোস্ট করেছে।
তার বন্ধু সৌরভ তার বউ-বাচ্চা সহ সুন্দর একটা ছবি দিয়েছে।
ইস! আজকে যদি পড়ালেখাটা শেষ করতে পারতাম, তাহলে আমিও হইত একটা চাকুরী করে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারতাম। অন্তত স্বামী-সন্তান নিয়ে একটা সুখের সংসারও যদি থাকত, ছবি গুলোতে লাইক দিতে দিতে ভাবল নিতু।
নিতু খেয়াল করে দেখল কে যেন তার জলপ্রপাতের ছবিতে লাইক দিয়েছে, শাহেদ। ওই ছেলেটা না! ভার্সিটিতে ফাস্ট বেঞ্চে বসত আর তার দিকে বেকুবের মত তাকিয়ে থাকত!
(২)
সেই সন্ধ্যা থেকে বাসায় বিদ্যুত নেই। নিচতালা বাসার একটা ছোট রুমে বউ আর দুই বছরের বাচ্চাকে নিয়ে শুয়ে আছে সৌরভ। ঢাকা শহরে নিচতলায় এক রুমের জানালা বিহীন বাসার থেকে ভাল বাসা ভাড়া করার সামর্থ্য তার নেই। বেসরকারী কোম্পানীর সামান্য সেলসম্যান সে। ভ্যাপসা গরমে ঘুম আসছে না তার। সময় কাটানোর জন্য মাথার কাছেই থাকা মোবাইলটা নিয়ে ফেসবুকে ঢুকল সে।
নিতু ফেসবুকে নুতন ছবি দিয়েছে দেখছি।
“সুজাতাই আজ শুধু সবচেয়ে সুখে আছে শুনেছি তো লাখ পতি স্বামী তার, হীরে আর জহরতে আগাগোড়া মোড়া সে গাড়ীবাড়ী সব কিছু দামী তার।” নিতু ছবি দেখার সাথে সাথে মান্না দের কফি হাউজ গানটা মাথায় ঘুরতে লাগল সৌরভের।
নায়গ্রা জলপ্রপাত দেখার সৌভাগ্য তো আর এই জন্মে হবেনা তবে এর সম্পর্কে একটু পড়ালেখা করা দরকার, বিসিএসে প্রশ্ন আসতেও পারে, মনে মনে ভাবল সৌরভ।
রানুও দেখি ভাল একটা চাকরী পেয়েছে। মেয়ে মানুষ হয়েও তারা ভাল চাকরী পেয়ে গেল, আর সে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।
তার উপর বউ-বাচ্চার ঝামেলা, কেন যে ভার্সিটি লাইফে প্রেম করতে গিয়েছিল।
নিজের উপরই রাগ হচ্ছে সৌরভের। পড়াশুনায় কখনই সিরিয়াস ছিলনা সে। আজ যদি সে শাহেদের মত পড়ালেখা করত, নিশ্চয় ভার্সিটির লেকচারার হতে পারত। ইস! আমার কপালে শুধু অন্যের ছবিতে লাইক দেওয়ায় আছে, ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেল সৌরভ।
(৩)
ফেসবুকে নিতুর দেওয়া ছবির দিকে তাকিয়ে আছে রানু। ওর ছবিতে এক ঘণ্টায় ১০৬ টা লাইক পড়েছে। আর তার ছবিতে মাত্র ৪১ টা।
খাবারের ছবি দিয়েছে, বাবা-মার কথা আবেগ দিয়ে লিখেছে তাই হইত অন্তত ৪১ টা লাইক পেয়েছে, শুধু নিজের ছবি দিলে হয়ত ১০টা লাইকও জুটত না।
লাইক শুধু নিতুর মত সুন্দর মেয়েরায় পায়, আর তার মত পচা দেখতে মেয়েরা পায় দয়া।
নিতুর মত সুন্দরীদের ভাগ্যও সব সময় ভাল থাকে, ভার্সিটিতে পড়া অবস্থায়ই শাহেদের মত ছেলেরাও তার উপর ক্রাস-ট্রাশ খেয়ে পড়ত। আর সময় গড়াতেই বিদেশ থেকে নামী-দামী বংশের বিয়ের প্রস্তাব আসা।
আর তার মত মেয়েরা সবার ভাল বন্ধু হয় কিন্তু কারন জীবন সঙ্গী হওয়ার কামনা হয় না, মনে মনে ভাবল রানু।
নিজের যোগ্যতায় এখন একটা ভাল চাকরী করছে সে। এই চাকরী কেন যেন তার জন্য অভিশাপ হয়ে উঠেছে।
গতকাল তার মা আর চাচীর কথা গুলো শুনেছে সে।
“বুঝলেন ভাবী, অসুন্দর মেয়েদের বেশি পড়ালেখা করতে নায়। চাকরী-বাকরী করা, বেশি জানা মেয়েরা স্বামীর ভাত পায়না।”
তার কপালে সৌরভ-নিতুদের মত সংসার আছে কি না, রানু জানেনা ।
(৪)
একটা মেয়ে এত সুন্দর করে কিভাবে ঝরনার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে, মনে মনে ভাবল শাহেদ। ছবির কমেন্টে অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছা হয় তার। কি হবে আর লিখে, ভাবতে ভাবতে ছবিতে প্রথম লাইকটা দিল শাহেদ।
মন খারাপ করে বসে আছে শাহেদ। নিজেকে, ভাল লাগছে না জেনারেশনের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর মনে হচ্ছে।
কি বা হত, ভার্সিটি লাইফের শুরুতে যদি সে নিতু কে বলতে পারত সে তাকে পাগলের মত ভালোবাসে।
না তার মত ছেলেরা এগুলো পারেনা, সৌরভের মত ভাগ্যবান সে নয়, মনে মনে ভাবল শাহেদ।
নিজের জীবন নিয়ে খুব দোটানায় আছে সে। ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট সে, ভার্সিটি তাকে লেকচারার হিসাবে যোগদান করতে বলছে।
তার বাবা চায়, তার একমাত্র ছেলে পড়াশুনা ছেড়ে সিলেটে এসে তাদের খানদানী ব্যাবসা দেখুক। আর চাকরী-বাকরী তো গোলামরা করে।
বাবা কে খুব ভয় পায় শাহেদ। কিন্তু রড-সিমেন্টের ব্যাবসা তার মাথায় ঢুকে না, বন্ধুদের ছাড়া ভার্সিটিও তাকে একদম টানে না।
“তোর তো সবই আছে”, ছোট বেলা থেকেই বন্ধুদের কাছ থেকে খোটা শুনে আসছে শাহেদ।
ইস! আজ যদি রানুর মত চাকরী করে নিজেকে যোগ্য প্রমান করতে পারত, হতাশ হয়ে ভাবল শাহেদ।
নিজের প্রোফাইল পিকচারটা চেঞ্জ করবে কিনা ভাবছে সে।
ধুর কি দরকার, ফেসবুক তো আয়নার মত, তার সুন্দর একটা ছবিতে হয়ত বন্ধুরা সবায় লাইক দিবে, হিংসা করবে কিন্তু তার মনের অবস্থা কি তারা বুঝতে পারবে।
“Facebook shows us what we look like, not who we are”- স্ট্যাটাস দিল শাহেদ।
সাথে সাথে তিনটা লাইক পড়ল; নিতু, রানু আর সৌরভের।

রাগীব হাসান অন্তর
৩১/০৩/২০১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here