গল্পঃ রুমাল পর্বঃ০১

0
1734

মালিবাগে চল্লিশোর্ধ্ব এক মহিলা মহিলা নাকি চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সী এক ছেলের সাথে তার সেক্স ভিডিও ভাইরাল হওয়াতে সুইসাইড করেছে।লাশ এখনো সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলছে।সাজু সাহেব,গাড়ি বের করতে বলুন দ্রুত।

নীল রঙা পুলিশের গাড়িটা সালাম ম্যানশনের সামনে এসে থেমেছে।বাড়ির নিচে শ’ খানেক মানুষের ভিড়। পুলিশ অফিসার মোস্তাক আহমেদ সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে এসেছে,পিছনে দুজন নারী পুলিশ সদস্যসহ আরো তিনজন। মোট ছয়জনের এক টিম।

মহিলার স্বামী তার সেভেন আর নাইনে পড়ুয়া মেয়ে দুটোকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে।মেয়ে দুটো গুঙিয়ে গুঙিয়ে সমানতালে কেঁদে চলেছে।উচ্চ-মধ্যবিত্তর ছাপ রয়েছে সারা ঘর জুড়ে। দেয়াল জুড়ে বেশ কটা ফ্যামিলি ফটো। তিনটা মেয়েকে মাঝে রেখে একপাশে বাবা আর অন্যপাশ সদ্য সুইসাইড করা মা।

গোলাপি রঙা জর্জেটের শাড়ির বেশ খানিকটা অংশ সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায়।মহিলার মেদহীন পেট, স্লিভলেস ব্লাউজ বলে দেয় এই বয়সে এসেও তিনি শরীরের সাথে বিন্দুমাত্র আপোষ করেননি। মিস নূপুর, ডেড বডি নামাবার ব্যবস্থা করুন।মোস্তাকের কমান্ড শোনা মাত্রই নূপুর সহ বাকি টিম ডেড বডি নামাতে শুরু করে।

আপনি এই ফ্যামিলির কে হোন? পান চিবুতে চিবুতে হঠাৎ করে কেঁদে ওঠা মহিলা দাঁত মুখ শক্ত করে বলল,আমি নিচেরতলার খালাগো রান্ধনে কাম করি।ঐ যে সাদা শার্ট পরা বেডারে দেহেন,হে অইলো ঝুমুর ভাবীর বড় ভাই।মোস্তাকের বুঝে নিতে কষ্ট হয়না ডেড বডির নাম ঝুমুর।

আচ্ছা এই বাসার কোন কাজের লোক নেই?
– হ আছে তো।হের মেয়ের বাচ্চা হইছে কালকা।তাই আহেনাই।

মোস্তাক কথা না বাড়িয়ে সাদা শার্ট পরা ভদ্রলোকের কাছে এসে দাঁড়ায়।ভদ্রলোক অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কেঁদে চলেছে। ভদ্রলোকের ফোন বেশ কয়েকবার বেজে উঠেছে, কান্নার কারণে ভদ্রলোক সেটা টের পাচ্ছেন না।মোস্তাক অপেক্ষা করছে কখন ভদ্রলোক ফোন ধরে। হ্যাঁ,মিনিট খানেক পরেই ভদ্রলোক ফোন ধরে কাঁদতে কাঁদতে কাকে যেন বলছে, আমার বোনকে ওরা মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে গো ভাই….ও ভাইইইই।ভদ্রলোক আবার কান্না শুরু করে দিয়েছে।মোস্তাক আর তার টিম ডেড বডি নিয়ে চলে এলো।

পোস্টমর্টেমে প্রত্যাশিত রিপোর্ট-ই এসেছে।অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি।গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল ঝুমুরকে তার স্বামী মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে কিন্তু পোস্টমর্টেমে ডেড বডির শরীরে কোন স্পট পাওয়া যায়নি।গলায় যে দাগ পাওয়া গেছে সেটা শাড়ির ই।

সপ্তাহ খানেক পর পুনরায় মোস্তাক আহমেদ কিছু প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর খুঁজতে শুরু করেছেন।

আপনার নাম কি?
– সোবাহান৷

আপনি ঝুমুরের কি হোন?
-বড় ভাই।

আপনি বলছেন আপনার বোনকে মেরে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।অথচ তখন ঝুমুরের স্বামী নাজমুল তখন অফিসে।বাসায় ছিল আপনার দুই ভাগনী।তাহলে আপনি কিভাবে দোষ দিচ্ছেন?

-নাজমুল একটা আস্ত শুয়ারের বাচ্চা,ও আমার বোনকে মেরে এখন অফিসের দোহাই দিচ্ছে।

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন,মার্জিত ভাবে কথা বলার চেষ্টা করুন।

-স্যার..ঐ নাজমুল ই আমার বোনকে মেরে ফেলে সুইসাইডের নাটক সাজাচ্ছে।

সোবাহান সাহেব বেশ খানিক্ষন কেঁদে কিছুটা শান্ত হয়ে,কান্নারত গলায় আবার বলল,
আমার বোনের গায়ে প্রায়ই হাত তুলত ও।আমার বোন বেশ কয়েকবার আমার বাড়িতে চলে এসেছে ওর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে।ওসব ভিডিও টিডিও নাজমুল অন্য কাউকে টাকা দিয়ে বানিয়েছে যাতে সবাই আমার বোনকে চরিত্রহীনা ভাবে।

দেখুন সোবাহান সাহেব,নাজমুল তখন অফিসে ছিল।উনার অফিসের প্রতিটা কলিগ,হাজিরা খাতা,উনার ডেস্কের সামনে থাকা সিসিটিভিতে তার প্রমাণ আছে।আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ আপনার দুই ভাগনী রিমি আর যুথি।তারাই বলছে তাদের বাবা তখন অফিসে ছিল।আর ভিডিওটা ইডিট করে,গলা কেটে বসানো না।আমাদের আইটি এক্সপার্টরা সেটাই বলছে।

-রিমি আর যুথি! ওরা তো ঐ শয়তানটার মুরিদ।বাপ যা বলে ওরা তাই ই করে।আমার বোন যতবার মার খেয়ে আমার বাড়িতে গেছে কোনবারই ওরা ওদের মায়ের সাথে যায়নি।আমার বোনটা মেয়ে দুটোর টানে শুধু মালিবাগে ফেরত যেত।

মোস্তাক আহমেদ কিছু নোটস রেখে সোবাহান সাহেবকে সেদিনের মত বিদায় দিয়ে দিল।

সাজু, এই সাজু।

সাজু মোস্তাক আহমেদের রুমে তড়িঘড়ি করে ঢুকল।স্যার,আমাকে ডেকেছেন?।

হ্যাঁ,এক কাজ কর।রিমি আর যুথিকে নিয়ে আসো।

সাজু ঘন্টা খানেক পেরোতে না পেরোতেই রিমি আর যুথিকে নিয়ে ঢুকল। সঙ্গে তেইশে পা দেয়া এক যুবতীও এলো।মোস্তাক আহমেদ যুবতীর চোখে চোখ রেখে বলল,আপনাকে ঠিক চিনলাম না।আপনি কে?

-আমি মিম। ওদের বড়বোন।

মোস্তাক আহমেদ বিপর্যস্ত গলায় বলল,হ্যাঁ আপনার কথা শুনেছি।আপনার বিয়ে তো রাজশাহীতে হয়েছে,তাইনা?

-হ্যাঁ

মোস্তাক আহমেদ চোখ ঘুরিয়ে রিমির দিকে চেয়ে বলল,তোমার মা যখন বাবার সাথে ঝগড়া বাঁধিয়ে তোমার মামাদের বাসায় যেত তোমরা দু বোন কেন যেতে না?

রিমি মিমের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেবার অভয় খুঁজছে,রিমি উদভ্রান্তের মত রিমির দিকে তাকিয়ে আছে।মোস্তাক আহমেদ দ্রুত গলায় বলল,উনার দিকে না। আমার দিকে তাকিয়ে বলো,তোমরা দুবোন যেতে না কেন?

-যুথি মাথা নিচু করে বলল,মা নিজের দোষেই আর নিজের সুবিধার জন্যই যেতেন মামাদের ওখানে।আমরা কেন বাবাকে মায়ের দোষে ফেলে যাব?

মোস্তাক আহমেদ ঠিক এই সন্দেহটাই করছিলো।কথোপকথন পর্ব সহজ করতে সাজুকে দিয়ে জুস,আর কেক আনিয়ে রাখা হয়েছে।এক স্লাইস কেক মোস্তাক আহমেদ মুখে পুরে নিয়ে বলল,তোমরাও নাও।তিনবোনের কেউ-ই নিল না।

মোস্তাক আহমেদ পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল,আচ্ছা রিমি তুমি বলো তো তোমার মা কেন মামার বাড়িতে যেত? কিসের জন্য যেত? দোষটাই বা কি?

রিমি আবারো মিমের দিকে তাকালো।মিম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, আসলে মায়ের একজনের সাথে অবৈধ সম্পর্ক চলছিল।যেটা নিয়ে বাবার সাথে প্রায় ঝগড়া হতো, মা আসলে ঝগড়া বাঁধানোর জন্য লেগেই থাকতেন।ঝগড়া বাঁধাতে পারলে মামাদের ওখানে চলে যেতেন তাতে ঐ ছেলেটার সাথে মিশতে সুবিধা হত তার। গত ছ মাস ধরে মাকে কম বোঝাইনি আমরা।তিনি নেশাখোরদের মত যাচ্ছেতাই ব্যবহার করতেন।বাবা সহ্য করতে পারতেন না।আমাদের দিকে চেয়ে সহ্য করে নিচ্ছেন কিন্তু কি থেকে যে কি হয়ে গেল! মিম এটুকু বলেই কেঁদে ফেলল।

মোস্তাক আহমেদ মিমকে শান্ত করে সামনের দিকে ঝুঁকে এসে বলল,ছেলেটা কি ভিডিওর সেই ছেলেটাই?

যুথি উত্তরে মাথা নিচু করে বলল, ‘হুঁ”

আচ্ছা,তোমরা আজ আসো।প্রয়োজনে তোমাদের বাবার সাথে আবার তোমাদের আসতে হতে পারে।

সাজু চেয়ারে বসতে বসতে বলল,স্যার মেয়েদের আর তার বাবার কথার সাথে মিল আছে।মহিলা যে অবৈধ সম্পর্কে জড়িত ছিল এর প্রমাণও আমাদের হাতে আছে।ছেলেটার খোঁজ চলছে। কেসের শেষ দেখছেন না আপনি?

মোস্তাক আহমেদ চোখ বুজেই বললো,হ্যাঁ তা দেখছি।ছেলেটাকে ধরতে পারলেই কেস উইল বি ক্লোজড। মোস্তাক সাহেব চোখ মেলে বললো,ছেলেটাকে ধরার ত্রুটি রাখবেন না।সব থানায় ছেলেটার ছবি পাঠিয়ে দিন।

ভাবা হচ্ছিল ছেলেটাকে ধরলেই কেস ক্লোজ হয়ে যাবে।কিন্তু না,ঘটনা সপ্তাহ তিনেক পেরোতেই অন্যদিকে মোড় নিল। বিজয় স্বরণীতে উবারের গাড়িতেই মিম মারা গেল।পোস্টমর্টেমে জানা গেল মিমের মৃত্যু হয়েছে বিষাক্ত বিষে। উবার ড্রাইভারের ভাষ্যমতে জ্যামে আটকে থাকার সময় মিম রুমাল কেনে। জ্যাম ছাড়ার পরও মিমকে ফোনে কথা বলতে দেখা গেছে।কাওরান বাজারের জ্যামে এসে ড্রাইভার সামনের গ্লাসে দেখে মিমের মুখ দিয়ে নীল লালা বের হচ্ছে।জ্যাম ছাড়া মাত্রই গাড়ি বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে নেয়া হলে ডাক্তার মিমকে মৃত বলে ঘোষণা করে।

মোস্তাক আহমেদকে মিমের বাবা নাজুল খবর দেবার পর।শাহবাগ থানার সাথে সে মিমের মৃত্যুর ব্যাপারটা খতিয়ে দেখছে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে,এত সুন্দর নকশা করা মনকাড়া রুমাল ঢাকা শহরের রাস্তায় বিক্রি করার কথা না।বিজয় স্বরণীর সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে দশ-এগারো বছর বয়সী এক কিশোরীর কাছ থেকে বিশ টাকায় এই রুমাল কিনেছে মিম।বিস্ময়ের জন্ম দিয়ে মেয়েটার বাঁ হাতে থাকা রুমালগুলো খোলা থাকলেও মিমকে দেয়া রুমালটা পলিথিনের ছোট প্যাকেটে মোড়া ছিল।

মোস্তাক আহমেদ ফ্যাশন ডিজাইনে কাজ করা কয়েকজনকে ডেকে পাঠিয়েছিল এমন নকশা কারা করে সেটা জানার জন্য।দুর্ভাগ্য বশত কেউ ই এর আগে এমন মনকাড়া, সুন্দর নকশা করা রুমাল দেখেনি।তারা এ ব্যাপারে কোন সাহায্যে করতে পারছেনা বলে দুঃখ প্রকাশ করল।

সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া ছবি থেকে রুমাল বিক্রি করা কিশোরীর খোঁজ চলছে।

চলবে….

পর্বঃ০১
গল্পঃ রুমাল
লিখেছেনঃBorhan Uddin

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here