গল্পঃরুমাল, পর্বঃ০৩

0
861

গল্পঃরুমাল, পর্বঃ০৩
মাস দুয়েক পেরিয়ে যাবার পরেও জহিরের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। তুরস্ক থেকে যে বিষের কৌটা আনা হয়েছিল চট্টগ্রামে সে বিষয়ে খোঁজ চলছে এখনো।শাহরিয়ারের পরিবর্তে রাশেদের রিমান্ডের জন্য দায়িত্ব পড়েছে নতুন পুলিশ অফিসার সাজ্জাদের কাঁধে।

ঝুমুর, মিমের কেস স্টাডি করে সাজ্জাদ দুটো সিদ্ধান্তে পৌঁছাল। রাশেদই মূল হোতা আর সে নানা গল্প বানাচ্ছে নয়তো আড়ালেও কেউ আছে যার ইশারায় রাশেদ কাজ করেছে।

লিকার চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মোস্তাক আহমেদ বলল, তা সাজ্জাদ সাহেব কতদূর এগোলেন?

-রাশেদের কথাগুলো আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।জহিরের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা।সে জহিরের যে নাম্বার দিয়েছে সেটা সুইচড অফ আর নাম্বারটাও এক মৃত ভিক্ষুকের নামে রেজিষ্ট্রেশন করা।যে কিনা মারা গেছে বছর দেড়েক আগেই! আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এই রাশেদই জহির। সে ডাবল ক্যারেক্টর রোল করছে।

হতে পারে জহির নানান অপরাধের সাথে অনেক আগে থেকেই জড়িয়ে আছে তাই নিরাপত্তার খাতিরে ভিক্ষুকের নামেই সিমের রেজিষ্ট্রেশন করেছিল।রাশেদ ধরা পড়াতে সে গা ঢাকা দিয়েছে।এমনটা কি হতে পারেনা?

-পারে স্যার।তবে রাশেদ বলেছে সে স্রেফ টাকার জন্য কাজটা করেছে কিন্তু সৌদি আল রাহ্জি ব্যাংকে তার একাউন্টে ষাট হাজার রিয়াল কেন? আল সাম্বা ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপে তার একাউন্টে চৌষট্টি হাজার রিয়াল কেন? যা কিনা বাংলা টাকায় প্রায় আটাশ লক্ষ টাকার সমান। এছাড়াও ডাচ বাংলা ব্যাংক, লংকা ব্যাংকে তার একাউন্টে প্রায় ছত্রিশ লক্ষ টাকা আছে।এরপরেও কি বিশ্বাস করা যায় সে স্রেফ দু চার লাখ টাকার জন্য ঝুমুর,মিমকে এভাবে মেরে ফেলবে?

মোস্তাক আহমেদ সাজ্জাদের কাজের স্পিরিটের প্রতি মুগ্ধ না হয়ে পারেনা।ধীর গলায় মোস্তাক আহমেদ বলল,হতেও পারে রাশেদের এত টাকার সোর্স নানা ধরনের অপকর্ম। নানা অপরাধে জড়িয়ে দ্রুত টাকা কামিয়েছে।

-তবুও তো প্রশ্ন থেকে যায়। সে টাকার বিনিময়ে কাজটা করলে তো কারো না কারো অর্ডারে কাজটা করেছে। সে বলছে এই অর্ডার জহির দিয়েছে তাকে বাট আনফরচুনেটলি জহিরের কোন অস্তিত্বই পাওয়া যাচ্ছেনা।তাই আমাদের হাতে রাশেদ ছাড়া আর কেউ নেই।

সাজ্জাদ আরো কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল এর মাঝেই মিস নূপুর রুমের বাইরে থেকে ভেতরে ঢোকার পারমিশন চাইলো।মোস্তাক আহমেদের অনুমতিতে মিস নূপুর রুমে ঢুকে একটা পেপার মোস্তাক আহমেদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, স্যার চিটাগং পোর্ট থেকে গতকাল মেইল করে তারা জানিয়েছে গত ছয় মাসে জহির নামে কোন প্রোডাক্ট তাদের কাছে আসেনি।তবে জহির মাল্টিমিডিয়ার নামে সিঙ্গাপুর থেকে ইলেকট্রনিকস প্রোডাক্ট এসেছিল।

মোস্তাক আহমেদ ইমেলের প্রিন্ট আউট কপিতে চোখ বুলাতে বুলাতে বলল,এই জহির সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন?

মিস নূপুর বলল, জ্বী স্যার। আমি গতকাল মেইল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খোঁজ নিয়েছিলাম।এই জহির রাজশাহীর বাসিন্দা,বয়স সাতাশ-আটাশ। আশ্চর্যজনকভাবে মিমের হাজব্যান্ডের বাড়িও রাজশাহীতে।

মোস্তাক আহমেদ খানিকটা নড়েচড়ে বসলেন।

সাজ্জাদ মোস্তাকের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে চোখ বোলাতে বোলাতে বলল,ব্যাপারটা জটিল হয়ে গেলো।রাশেদের দেয়া বর্ণনার জহিরের সাথে এই জহিরের কোন মিল নেই।চিটাগং পোর্ট থেকে বলা হচ্ছে এই জহির কোন কৌটা আনেনি তুরস্ক থেকে বরং এই জহির সিঙ্গাপুর থেকে ইলেকট্রনিকস প্রোডাক্ট এনেছে।এই জহিরের বাড়ি মিমের হাজব্যান্ডের শহরেই, কেসটা মনে হচ্ছে নতুন দিকেই মোড় নিচ্ছে।সাজ্জাদ মোস্তাক আহমেদের দিকে কাগজটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,স্যার মিমের হাজব্যান্ডকে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থা করুন।

রাশেদের চোখের নিচে বেশ কালি জমেছে।খোঁচা দাড়ির বদলে চার আঙুল সমান দাড়ি গজিয়েছে।ফর্সা মুখখানা ঘুষিতে কালচে হয়ে আছে।সাজ্জাদের সামনে এনে বসানো হয়েছে রাশেদকে।

তুই বললি তুই স্রেফ টাকার জন্য কাজটা করেছিলি।তোর দেশে বিদেশে সব মিলিয়ে সত্তর লাখের মত টাকা আছে নানা ব্যাংকে।এই টাকার সোর্স কি?

-রাশেদ ক্লান্ত চোখে সাজ্জাদের দিকে তাকিয়ে বলল,আমার ডাচ বাংলা ব্যাংকে লাখ খানেক টাকা ছিল স্যার।আমার অন্য ব্যাংকের একাউন্ট গুলোতে টাকা ছিল না কোন।স্যার আমার মা সৌদিতে যেয়ে আবার বিয়ে করেছেন।মা শুধু আমার ফ্লাইটের খরচ দেন,আর মাস শেষে কয়েক হাজার রিয়াল হাতে গুঁজে দেন।মায়ের পাথরের ব্যবসার জন্যই তিনি আমাকে ডেকে পাঠান।আসলে আমি যে লাইফ স্টাইল বেছে নিয়েছিলাম সেখানে টাকার দরকার ছিল। তাই নানা সময়ে নানা অন্যায় করে টাকা কামিয়েছি।আপনারা ভাবছেন ঝুমুর, মিমকে আমি নিজ স্বার্থে মেরেছি কিন্তু আমি পুরো কাজটাই টাকার বিনিময়ে করেছিলাম জহিরে অর্ডারে।স্যার খোদার কসম,আমার একাউন্টে লাখ খানেকের বেশি টাকা নেই। আমাকে বিশ্বাস করুন স্যার।স্যার আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ..।রাশেদ এটুকু বলেই কাঁদতে শুরু করে দিল।

সাজ্জাদ টেবিলে সজোরে ঘুষি মেরে বলল,ড্রামা অন্য কোথাও করবি বাস্টার্ড। তুই বলেছিলি জহির চিটাগং পোর্ট থেকে বিষের কৌটা রিসিভ করেছিল।জহিরের বয়স নাকি পঞ্চাশ! তোর দেয়া মিথ্যে বর্ণনায় পোট্রের্ট এঁকে সব থানায় পাঠিয়েছিলাম।তুই জহিরের মিথ্যে পরিচয় আর ভুল ফোন নাম্বার দিলি কেন? জহির তো রাজশাহী থাকে। তার বয়সও সাতাশ-আটাশ। মিথ্যে বললি কেন?
সাজ্জাদ এটুকু বলেই গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে রাশেদের গালে চড় বসিয়ে দেয়।রাশেদ একটুর জন্য চেয়ার থেকে পড়েনা।

রাশেদ গুঙিয়ে কেঁদে ওঠে।সাজ্জাদের ধমকে কান্না থামিয়ে বলল

-স্যার, খোদার কসম আমাকে যে জহির কাজের অর্ডার দিয়েছিল তার বয়স পঞ্চাশের উপর।চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলে সে। তার বাড়িও চিটাগং। আর ভুল নাম্বার কেন দিব স্যার! আমার সাথে ঐ নম্বরেই যোগাযোগ করত সে।আর ইস্কান্দারের কাছ থেকে বিষের কৌটাটা নিয়ে আমি নিজেই তুরস্কের এলেমদার পোর্টে পৌঁছে দিয়েছিলাম।আর বাংলাদেশ থেকে সেটা রিসিভ করার কথা ছিল জহিরেরই।আর সেটা জহিরই রিসিভ করেছিল।

সাজ্জাদ সেদিনের মত জিজ্ঞাসাবাদ স্থগিত করে রাজশাহীর সেই জহিরকে মালিবাগ থানায় ডেকে পাঠায়। ঘন্টা তিনেক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানান প্রশ্নের পর পরিষ্কার হয় এই জহিরের সাথে আসলেই মিমের হাজব্যান্ডের কোন সম্পর্ক নেই।ওদিকে জানা যায় মিমের হাজব্যান্ড মিমের শোকে খাওয়াদাওয়া ছেড়ে, রাত জেগে জেগে অসুস্থ হয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি। মোস্তাক আহমেদ আর মিস নূপুর হাসপাতালে যেয়ে বেশ কদিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তারা একই সিদ্ধান্তে আসে রাজশাহীর সেই জহিরের সাথে মিমের হাজব্যান্ডের কোন যোগাযোগ কখনো হয়নি।দুজন দুজনকে চেনেওনা।

মোস্তাক আহমেদরা ধরেই নিয়েছিল রাশেদ বানিয়ে তাদের গল্প শুনিয়েছে। রাশেদ হয়তো কোনভাবে ঝুমুর আর মিমের সাথে পরিচিতি ছিল।যেটা ঝুমুরের ফ্যামিলি জানেনা।হয়তো কোন রেষারেষি থেকেই মিমকে খুন করেছে সে।

কিন্তু না। কেসের গতিপথ ঘুরে যায় দিন সাতেক পরেই। দেশের বেশ কয়েকটা জাতীয় পত্রিকায় খবর আসে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জহির নামের পঞ্চাশোর্ধ এক ব্যক্তির গলা কাটা লাশ মিলেছে নদীর ধারে। কোন পত্রিকাই মৃতের মুখের ছবি ছাপায়নি।মোস্তাক আহমেদের ফরমায়েশে চিটাগং পুলিশ ইমেলেই জহিরের গলা কাটা ছবি পাঠিয়েছে।মুখের খানিকটা থেতলে গেলেও মোস্তাক আহমেদের বুঝতে কষ্ট হয়না যে এটাই রাশেদের বর্ণনা দিয়ে আঁকানো পোট্রের্টের সেই পঞ্চাশোর্ধ জহিরই।

সাজ্জাদ,মোস্তাকরা যখন ভাবছিল এই কেসের সর্বশেষ সাক্ষীর মৃত্যুতে কেসটা অন্ধকারে চলে গেছে তখনই তুর্কি পুলিশ থেকে জানানো হলো বাংলাদেশ পুলিশের দেয়া বর্ণনা আর পোট্রের্ট এর সাহায্য নিয়ে তারা ইস্কান্দার নামের এক ব্যক্তিকে ধরেছে। যে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন যাবত বিষের ব্যবসা করে আসছে।

সাজ্জাদ,মোস্তাকদের অবাক করে দিয়ে ইস্কান্দারের বিবৃতিতে বেরিয়ে আসে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। তুর্কি পুলিশ ইমেইল করে জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে অর্ডার আসে রাশেদ নামের এক যুবকের কাছে পনেরোশ ডলারের বিনিময়ে এক কৌটা বিষ যেন সে দেয়। বাংলাদেশ থেকে যে নম্বরে ইস্কান্দারের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল সে নম্বর মালিবাগ থানা থেকে বাংলাদেশ টেলিকমুনিউকেশনে যাবার পর তারা দিন দুয়েক পর জানিয়েছে নম্বরটি কক্সবাজারের হিভেন রিসোর্টের।

মোস্তাক আহমেদের পারমিশনে সাজ্জাদকে রাতের ফ্লাইটেই কক্সবাজার পাঠানো হয়েছে।

ভোর রাত থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে।সাজ্জাদ সি প্যালেস নামের ফাইভ স্টার হোটেলে এসে উঠেছে।বেলকনির সামনের অংশ মস্ত গ্লাসে ঢাকা।স্বচ্ছ গ্লাসের উপর বৃষ্টির পানি এসে পড়ছে।বেলকনি থেকেই সামনে উত্তাল সমুদ্র।বৃষ্টি কমে আসবে এই আশাতে সাজ্জাদ অপেক্ষা করছে।ঘন্টাখানেক পরে বৃষ্টি থেমে সূর্য উঠেছে।সূর্যের মিহি আলোতে বাইরে বেরিয়ে আসা মাত্রই কক্সবাজার পুলিশের গাড়ি দেখতে পেল সাজ্জাদ।মোস্তাক আহমেদ গতকাল রাতেই উর্ধতন পুলিশ অফিসারের সাহায্য চেয়ে রেখেছিলেন।পুলিশের গাড়িতে উঠতেই সাজ্জাদকে ওয়েলকাম জানালো অফিসার আরমান মাহবুব।বৃষ্টিস্নাত পিচঢালা রাস্তায় দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে সাজ্জাদরা।উদ্দেশ্য হিভেন রিসোর্ট।

চলবে…

লিখেছেনঃ Borhan uddin

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here